রবিবার, ০৫ Jul ২০২৬, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন

কেয়ারিং হাজবেন্ড

নিউজ ডেস্ক, নগরকন্ঠ.কম : কিছুদিন ধরে সাব্বিরের সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলি না। কেন বলি না- সে কারণটিও পরিষ্কার করে বলি না। পরিষ্কার করে বলারও কিছু নেই! ফেসবুকের গার্লস গ্রুপের মেয়েগুলো সারা দিন হাজবেন্ডের দেয়া কত কত সারপ্রাইজ গিফট শেয়ার করে আর হাজার হাজার রিয়্যাক্ট পায়!

একাশি ডজন চুড়ি, তেইশ-চব্বিশটি শাড়ি ও পঁচিশটি লাভ লেটার- এমনকি সরি বলার জন্য ম্যাচিং শাড়ি, চুড়ি ও গোলাপ ফুল! এগুলো দেয়ার জন্য কত টাকা-ই আর লাগে! লাগে একটি সুন্দর মন। সেই মনটি-ই সাব্বিরের নেই! আমাদের বিয়ের বয়স তিন বছর। এ তিন বছরে আজ পর্যন্ত সাব্বির এমন কিছু আমার জন্য করেছে? কিন্তু এটি নিয়ে ঝগড়া করারও আসলে কিছু নেই। কী বলব? আমাকে এগুলো এনে দাও; আমি পোস্ট দিব? নাহ! কিছু-ই বলব না; কথা-ই বলব না!

আমার আচার-আচরণে সাব্বির অস্বস্তি বোধ করে। আজ কিছুদিন হল ‘পড়াশোনা হচ্ছে না’ অজুহাতে আলাদা রুমে ঘুমাই। খাওয়ার সময়টি ছাড়া ঠিকমতো সারা দিনে দেখা-ই হয় না আমাদের।
সাব্বির আবার কিছুটা সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত প্রকৃতির মানুষ। বউকে গিফট দেবে না ঠিক-ই আবার বউ লাগবে লয়্যাল! ঠিক আছে, লয়্যাল আমি আছি-ই। কিন্তু কিছুদিন ঠিকমতো ওর সঙ্গে কথা বলি না দেখে ওর মনে সন্দেহ জেগেছে, আমি ভার্সিটির কোনো ইয়ারমেটের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে-টম্পর্কে জড়িয়ে গেছি।
সন্দেহ খুব খারাপ রোগ।

তিল হয়ে মনের ভেতর ঢুকে ধীরে ধীরে বড় সাইজের তাল হয়ে যায়। আজ সকালে তাই ভার্সিটি গিয়েই বেস্ট ফ্রেন্ড কাজলের কাছ থেকে জানলাম, সাব্বির ওকে কল দিয়েছিল এবং আমি ইদানীং ওর সঙ্গে কথা-টথা বলি না- এসব নিয়ে কথাবার্তা বলেছে। কাজল স্ট্রেইট-ফরোয়ার্ড মেয়ে। সরাসরি বলে দিয়েছে, আমার কোনো অ্যাফেয়ার-ট্যাফেয়ার নেই। গার্লস গ্র“পের পোস্ট দেখে আমি আপসেট। গিফট দেয় না বলে কথা বলি না!

বাসায় এসে পর্যন্ত ভয় আর চিন্তা মিশ্রিত অবস্থায় পায়চারি করছি। না জানি সাব্বির কী করে! ঝগড়া করবে না গিফট নিয়ে আসবে? গিফট নিয়ে এলে আমি অবশ্যই অবশ্যই নিব না! এ গিফট দায়সারা গিফট; লাগবে শুনেছে, তাই দিচ্ছে; এর মধ্যে কোনো ভালোবাসা আছে? নেই! আমি মরে গেলেও নিব না; আর ঝগড়া করলে বাপের বাড়ি চলে যাব। ডিসিশন ফাইনাল!
সাব্বির কিছু-ই করল না। রাতেও খেল না। অফিস থেকে বাসায় এসেই সোজা বিছানায় পড়ে ঘুম। আমার একটু সন্দেহ সন্দেহ হল, নেশা-টেশা করে আসেনি তো! কিন্তু কিছু-ই বললাম না ওকে। যা ইচ্ছা করুক।
আজ শুক্রবার। সাব্বির বাসাতেই আছে। দু’দিন পর-ই আমার অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা। সাব্বিরকে নিয়ে এখন মাথা ঘামানোর মতো সময়ও নেই বিধায় পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত আছি। ঠিক এমন সময় কলিংবেল বাজল।
দরজা খুলে আমি হতভম্ব। সাব্বির এগুলো কী করছে! অনলাইন শপ থেকে একগাদা প্যাকেট ঘরের ভেতর রেখে চলে গেল এক ছেলে।
‘খোল; আনপ্যাক করে দেখ।’ পাশ থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল সাব্বির।
আমার চোখ-মুখ শক্ত হয়ে গেল। এদিকে দেখার লোভও সামলাতে পারছি না! কিন্তু আমি তো শপথ করেছি, গিফট আমি নেব না! কিন্তু দেখার মধ্যে তো কোনো দোষ নেই! দেখব; তারপর নেব না। ব্যস, মিটে গেল!
চোখ কপালে বলে যে প্রবাদ বাক্যটি প্রচলিত আছে, গিফট খুলে আমার সেই দশা হল!
কয়েকশ’ কলম, ম্যাটাডোর অলটাইম! মনে হচ্ছে, বাজারের সব কালার পেন এবং ফাইল কিনে নিয়ে এসেছে সাব্বির! সেসঙ্গে শ’পাঁচেক স্কেল এবং রঙ-বেরঙের পেন্সিল!
আমি বাক্যহারা হয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম। সাব্বিরের চোখে-মুখে খুশি ঝরে ঝরে পড়ছে! আমি হতভম্ব হয়ে বললাম, ‘হোয়াট ইজ দিস?’

সাব্বির হাসিমুখে বলল, ‘গার্লস গ্রুপের ছেলেগুলো তো একটা উপলক্ষ্য ধরে বউকে গিফট দেয়! আমার তো সামনে একটিই উপলক্ষ! তোমার পরীক্ষা! তাই পরীক্ষার সব আইটেম নিয়ে এসেছি। রাত জেগে রিসার্চ করছি, তোমার পছন্দের কলম, স্কেল ও পেন্সিল সব আছে। এবার গার্লস গ্র“পে ‘কেয়ারিং হাজবেন্ড’ শিরোনামে পোস্ট দাও! প্রচুর রিয়্যাক্ট পাবা!’
কিন্তু রিয়্যাক্ট কি আমি চেয়েছি? আমি চেয়েছি, ভালোবাসাটা। সে বুঝেছে রিয়্যাক্টটা! গলা দিয়ে কথা বের হল না আমার!

নগরকন্ঠ.কম/এআর

Please Share This Post in Your Social Media

© All rights reserved © 2017 Nagarkantha.com